ATN
শিরোনাম
  •  

আল-আকসা মসজিদ কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ?

         

আল আকসা মসজিদ

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে চলমান যুদ্ধে যে বিষয়টি সব থেকে বেশি সামনে চলে আসে, সেটি হচ্ছে আল আকসা মসজিদ। মুসলমানদের কাছে এই মসজিদের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য। মক্কা ও মদিনার পর জেরুসালেমের আল আকসা মসজিদকে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবছর ফিলিস্তিন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মুসলিম আসেন এই মসজিদ প্রাঙ্গণে। মসজিদটি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। গত কয়েক বছর ধরে আল আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি বাহিনী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই এলাকাটি এত স্পর্শকাতর কেন?

এর জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পেছনের দিকে। পবিত্র কোরানের সূরা বনিইসরায়েলের ১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তার বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। এই আয়াতে মূলত নবী কারিম সা. কে মক্কা থেকে মসজিদ আল আকসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঊর্ধ্ব আকাশে গমনের আগে এখানে তিনি নামাজ পড়িয়েছিলেন। ইসলামের তথ্যানুসারে, মদিনা থেকে নবী কারিম সা. এর যাত্রা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি ঘটেছিল আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শনের মাধ্যমে।

রাসূল সা. জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসায় পৌঁছানোর পর সেখান থেকে ঊর্ধ্ব আকাশে গমন করেন। রাসূল সা. এমন এক সময় মেরাজে গিয়েছিলেন যখন তিনি ধর্ম প্রচারের জন্য নিজ গোষ্ঠী এবং পরিবারের লোকের দ্বারা অপমান এবং নির্যাতনের শিকার হতেন। পবিত্র কোরানে বিভিন্ন আয়াত এবং হাদিসে মসজিদ আল আকসার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া কোরানে দুটি মসজিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো মক্কার মসজিদ আল হারাম এবং অন্যটি জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদ আল আকসা। পবিত্র কাবার আশেপাশের এলাকাকে আল হারাম বলা হয়। যেখানে বিশ্বের মুসলিম স¤প্রদায় একত্রিত হয়ে আল্লাহ’র পবিত্রতা ঘোষণা করেন।

পবিত্র কাবাকে আল্লাহর ঘর বলা হয়। একইভাবে পবিত্র কোরানে আল আকসা মসজিদকে বায়তুল মাকদিসের কেন্দ্র হিসাবেও বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ ‘পবিত্র ভূমি’ এবং ‘বারাকাহ ভূমি’ বা পরিত্রাণ ও শান্তির দেশ। কোরানে আল আকসা এবং এর আশেপাশের এলাকাকে ‘বরকতময়’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, "আর্শীবাদপুষ্ট ভূমি" শব্দের অর্থ এমন একটি ভূমি, যার উপর মহান আল্লাহ শারীরিক ও আধ্যাত্মিক অনুগ্রহ দান করেছেন, যেখান থেকে সমস্ত সৃষ্টি লাভবান হতে পারে। পৃথিবীতে যেসকল নবী রাসূলগণ এসেছেন তাদের সবার সঙ্গে মসজিদ আল আকসার একটা সম্পর্ক ছিল। এজন্য এ মসজিদ মুসলিমদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া শেষ নবী রাসূল সা. নিজেও আল আকসা মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা করেন। রাসূল সা. যেদিন মেরাজে গমন করেন সেদিন মসজিদ আল আকসায় পৌঁছানোর পর তিনি ইমামতি করান। যেখান সকল নবীগণ উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে সূরা বাকারার ১৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- তোমরা বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের উপর ও যা নাযিল করা হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াক‚ব ও তাদের সন্তানদের উপর আর যা প্রদান করা হয়েছে মূসা ও ঈসাকে এবং যা প্রদান করা হয়েছে তাদের রবের পক্ষ হতে নবীগণকে। আমরা তাদের কারো মধ্যে তারতম্য করি না। আর আমরা তারই অনুগত’।

এছাড়া মসজিদ আল আকসা মুসলমানদের প্রথম কেবলা। আল্লাহর পক্ষ থেকে কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ার নির্দেশ আসার আগে মসজিদ আল আকসা ছিল প্রথম কেবলা। যার দিকে ফিরে ইবাদাত করা হত। আল আকসা কোথায় অবস্থিত? ১৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে অবস্থিত আল -আকসা প্রাঙ্গণে রয়েছে আল-আকসা মসজিদ, যা কিবলি মসজিদ নামেও পরিচিত। এছাড়াও আছে সোনালী গম্বুজবিশিষ্ট ‘ডোম অফ দ্য রক’, যা জেরুসালেমের সবচেয়ে স্বীকৃত একটি ল্যান্ডমার্ক এবং এই দুটিই পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। পূর্ব জেরুসালেমের পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত আল-আকসা মুসলিমদের কাছে ‘হারাম আল-শরীফ’ নামে পরিচিত। এখানে ১৫টি গেট ছিল, যেদিক দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করতো জেরুজালেমের ওল্ড সিটি থেকে আসা ধর্মানুরাগীরা । যদিও এই গেটের মাত্র ১০টি এখন ব্যবহৃত হয় এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ।

আল-আকসায় প্রথম ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর, পরে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম বড় আকারে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আল আকসা অর্থ কী? আরবি ভাষায়, আল-আকসার দুটি অর্থ রয়েছে: ‘সবচেয়ে দূর’, যা মক্কা থেকে এর দূরত্বকে বোঝায়। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ‘সর্ব্বোচ্চ’হিসেবেও মুসলিমদের কাছে এর মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আল আকসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রাঙ্গণের যেমন ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের সংস্কৃতি ও জাতীয়তার প্রতীকও এটি। সোনালী গম্বুজের ‘ডোম অফ দ্য রক’ সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে স্বীকৃত এবং এই স্থানে প্রার্থনা করতে আসতে পারা একটি বড় সুযোগ বলে মনে করেন মুসলিমরা। বর্তমান সীমানাগুলো তৈরি হবার আগের বছরগুলোতে, সেই পুরনো আমলে মুসল্লিরা পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও সেই সফরে জেরুসালেমকেও অন্তর্ভুক্ত করতেন । আল-আকসার বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ এখনও হাজার হাজার ধর্মানুরাগীকে আকৃষ্ট করে, যারা প্রতি শুক্রবার জামাতে নামাজের জন্য জড়ো হন।

ডোম অব দ্য রক’জেরুজালেমের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্ক রয়েছে আল আকসায় এবং ইসলামিক যুগের প্রারম্ভিক পর্যায়ের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই প্রাঙ্গণে। ধর্মীয় ভবন, বিভিন্ন ধরনের গম্বুজ, মিনার, স্তম্ভের ঐতিহাসিক কাঠামো ছাড়াও রয়েছে ৩০টি পানির উৎস। ইসলামি স্থাপত্যের প্রাচীন নমুনার দেখা মেলে আল আকসায়। আল আকসার দেয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে মিম্বার। এবং মামলুক ও আইয়ুবী যুগের ঐতিহাসিক বিদ্যালয়ের নিদর্শনও আছে এখানে। আরবি ভাষায়, ‘ডোম অব দ্য রক’কে ‘কুব্বাত আল-সাখরা’ বলা হয় যেটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

পশ্চিমা বিশ্ব, আল-আকসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন ওয়াল, যা আল-বুরাক প্রাচীর নামেও পরিচিত। মরোক্কোন গেট ও প্রফেট গেট বা বাব আল নাবি গেটের মাঝখানে রয়েছে প্রাচীরটি এবং এই এলাকায় একটি ছোট মসজিদও রয়েছে যা বুরাক মসজিদ নামে পরিচিত, যেটা ১৩০৭ থেকে ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আল কিবলি মসজিদ আল আকসা মসজিদ কোনও একক মসজিদ নয়। আল আকসা মসজিদ মানে- কিবলি মসজিদ, মারওয়ানি মসজিদ ও বুরাক মসজিদের সমন্বয়।

রূপালি-গম্বুজ বিশিষ্ট আল কিবলি মসজিদটি আল-আকসার দক্ষিণ প্রাচীরের দিকে রয়েছে এবং এটি এই প্রাঙ্গণে মুসলমানদের নির্মিত প্রথম ভবন। এটা এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি এবং এখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়েন একজন ইমামের নেতৃত্বে। মুসলমানরা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করে, তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন আল-খাত্তাব এবং তার সঙ্গীরা মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। আশি মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৫ মিটার প্রস্থের এই মসজিদটিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

সহিংসতার কেন্দ্র আল আকসা কেন?আল আকসা প্রাঙ্গণটি মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান- তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র স্থান। যুগ যুগ ধরে এই এলাকা ঘিরেই চলছে বিবাদ। বলা যায় ঐতিহাসিকভাবে এটি বিবাদের ইস্যু। সরায়েলি সরকারের সাথে সমঝোতা অনুযায়ী নানা বিধিনিষেধ ও শর্তপূরণের মাধ্যমে - শুধুমাত্র মুসলিমরাই আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢুকে প্রার্থনা করতে পারেন। অন্যদিকে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা আল আকসায় শুধু পর্যটক হিসেবে প্রবেশ করতে পারবেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন তাদের জন্য আল আকসা খোলা এবং দিনে চার ঘণ্টা সময় পাবেন ওই এলাকা ঘুরে দেখার জন্য। জেরুসালেমে ধর্ম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আল আকসা প্রাঙ্গণ সংঘর্ষ-সহিংসতার একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

ইহুদি দর্শনার্থীরা নিয়ম অমান্য করে আল আকসায় প্রার্থনা করেছে, কেউ প্রকাশ্যে কেউবা মুসলিমের বেশে। নানান সময়ে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় বিক্ষোভ সংঘর্ষ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। সবশেষ নিজ ‍ভূমি রক্ষায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীরা।

রিপোর্ট : সোহাগ বিশ্বাস
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট বিশ্ব সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ