ATN News
শিরোনাম
  •  

দুঃসময়েও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বুক চিতিয়ে আমাদের পাশে ছিলেন: রিজভী

         
দুঃসময়েও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বুক চিতিয়ে আমাদের পাশে ছিলেন: রিজভী

দুঃসময়েও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বুক চিতিয়ে আমাদের পাশে ছিলেন: রিজভী

সংকটময় ও কঠিন সময়েও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন পাশে ছিলেন উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বহুমুখী কর্মদক্ষতা, মেধা ও অনন্য ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন হলে ‘সারেঙ’ পত্রিকার ‘রেজাউদ্দিন স্টালিন সংখ্যা’র প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গত জুনে প্রকাশিত এই বিশেষ সংখ্যাটি কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ও দেশের অন্যতম বড় কবি হিসেবে উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি দিনে-রাতে প্রচুর পরিশ্রম করেন এবং সবসময় হাতের কাছে সহজে পাওয়া যান বলেই তাকে আমরা বন্ধুসুলভ মনে করি, কিন্তু সেভাবে হয়ত গুরুত্ব দিই না। অথচ তার কবিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বরা ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অস্ট্রেলিয়াতে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং এশিয়ার প্রথম নোবেল লরিয়েট হিসেবে পরিচিত করার কারিগর শিবনারায়ণ রায় একটি অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে স্টালিনের কবিতার পর আলোচনা ও প্রবন্ধ লিখেছেন।

এছাড়া দেশের অগ্রগণ্য ও খ্যাতনামা সাহিত্য বিশ্লেষক অধ্যাপক ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ডক্টর আবুল কাসেমসহ অসংখ্য গুণীজন তার কবিতার অসাধারণ মূল্যায়ন করেছেন। তাই এটি কোনো ছোটখাট বিষয় নয়, অন্য কবিরা তাকে যথার্থই ‘কবিদের কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

নিজের কবিতা অনুরাগের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, ছাত্ররাজনীতি করার সময় সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে লেখা অনুপ্রেরণাদায়ক কবিতা পড়ে তারা উদ্দীপ্ত হতেন। তারুণ্যের প্রেম ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে লেখা কবিতাগুলোও আবৃত্তি করতে দারুণ লাগত। তিনি জানান, একজন কবিতা অনুরাগী মানুষ হিসেবে বড় কবিদের হৃদয়ে দাগ কাটা আবৃত্তিযোগ্য কবিতাগুলোই তিনি বারবার পড়েন।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি ২০১৫ সালের জেলখানার একটি স্মৃতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, জেলখানায় থাকা অবস্থায় ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি লেখা তার চোখে পড়ে। সেখানে ড. চৌধুরী চমৎকার মন্তব্য করেছিলেন যে– রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা লেখার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে বিশৃঙ্খলা মনে হলেও সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই তিনি শৃঙ্খলার যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেন, যা তার প্রকৃত প্রতিভার পরিচয় দেয়।

সাধারণ কবিদের গতানুগতিক ধারণার কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, সমাজে কবি বলতেই সাধারণত লম্বা পাঞ্জাবি পরা, ঢিলেঢালা ভাব কিংবা মাসে একবার গোসল করা নিয়ে সন্দেহ থাকার মতো একটি চিত্র প্রচলিত থাকে। কিন্তু রেজাউদ্দিন স্টালিন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি অত্যন্ত স্মার্ট, পরিচ্ছন্ন ও চটপটে মানুষ। সকালে এক জায়গায় কথা বলে অফিসে গিয়ে নজরুলের ইনস্টিটিউটে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ কর্মকর্তাদের সামলানো এবং সচিবালয়ে বোর্ড মিটিং ম্যানেজ করার মতো গুরুদায়িত্ব তিনি দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। এর পাশাপাশি প্রতি মিনিটে হিসাব রেখে নিজের পরিবার ও স্ত্রীকেও সময় দেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার এই কর্মযজ্ঞ এবং পেছনের মানসিক শক্তি সত্যিই প্রশংসনীয়। কবিতা লেখার জন্য নির্জনতা ও নিঃসঙ্গতার প্রয়োজন হলেও এত ব্যস্ততার মধ্যে মনের ভাবনার উপযুক্ত রূপ দিয়ে তার কবিতা লেখা এক কথায় অসাধারণ।

রাজনীতিবিদ ও কবিদের সহ্যশক্তির পার্থক্য তুলে ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, রাজনীতিবিদদের যেমন সমালোচনা ও গালাগালি সহ্য করার অফুরন্ত সহ্যগুণ (টলারেন্স) থাকতে হয়, তেমনি কবিরা সাধারণত অত্যন্ত আত্ম-অভিমানী হন– কেউ কিছু বললে চট করে অভিমান বা রাগ করে সরে দাঁড়ান, না পারলে কাব্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। তবে স্টালিনকে আপাতদৃষ্টিতে এগ্রেসিভ মনে হলেও তার ভেতরটা খাঁটি কবিহৃদয়। এমনকি তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমসাময়িক বিরোধী কবিও স্বীকার করেছেন যে, স্টালিনের ‘সমগ্র সত্তাটাই কাব্য এবং গোটা সত্তাটাই কবি’। পেশাগত বা সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা থাকলেও সেই কবি তার খাঁটি কবিসত্তা নিয়ে সত্য উচ্চারণ করেছেন। ব্যক্তিজীবনে স্টালিন অত্যন্ত বিনয়ী, বন্ধুসুলভ ও সামাজিক। রাত ৯টা বা সাড়ে ৯টার দাওয়াতে তিনি ঠিক সময়ে উপস্থিত হন। শূন্য থেকে সবকিছু গঠন করার এবং অসাধারণ পাবলিক রিলেশনের ক্ষমতা তার রয়েছে।

সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি একজন অর্থনীতিবিদের অনুষ্ঠানে সরকারের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক আলোচনার পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছিল, যা শুনে তিনি আনন্দিত হন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, উপযুক্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকলে সেটি কতটা কর্মময় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে, যার প্রমাণ রেজাউদ্দিন স্টালিন।

গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়নের কথা স্মরণ করে রিজভী বলেন, সেই কঠিন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ মামলা ছিল, তারা বারবার কারাবাসের শিকার হয়েছেন। সরকারি রোষানলের ভয়ে অনেক নিকটাত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব তাদের ছেলেমেয়ের বিয়েতেও দাওয়াত দিতে সাহস পেত না। কিন্তু সেই চরম দুর্দিনেও রেজাউদ্দিন স্টালিন বুক চিতিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন এবং সাহস জুগিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।

রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে কবিসত্তার স্বাধীনতার বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব উদাহরণ দিয়ে বলেন, ড. মাহবুবুল্লাহ তাদের দলকে পছন্দ করলেও কখনো দলের সদস্য হননি। এমনকি কাজী নজরুল ইসলাম কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হওয়া সত্ত্বেও নিজে কখনো মেম্বার হননি। রেজাউদ্দিন স্টালিনের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সিমপ্যাথি থাকতে পারে, কিন্তু তিনি কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর শৃঙ্খলে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। একজন বড় কবির এটাই নিদর্শন– সব জায়গায় সমর্থন থাকবে, কিন্তু তিনি মুক্ত বিহঙ্গের মতো থাকবেন। পার্শ্ববর্তী দেশসহ দেশে-বিদেশে তিনি বড় বাঙালি কবি হিসেবে সমাদৃত।

কবিতার আধুনিকতা নিয়ে রিজভী বলেন, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন নিঃসন্দেহে একজন আধুনিক কবি। তার কবিতার আঙ্গিক, শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গিতে আধুনিকতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। বৈশ্বিক সংকট তুলে ধরে তার কবিতার একটি পংক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘একদিন সবাইকে বৃক্ষের জন্য কাঁদতে হবে’ —যা জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের বাস্তবতায় অত্যন্ত সত্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। সমকালীনতা ও বৈশ্বিক সংকট কবিতায় ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমেই তিনি বড় কবি হয়ে উঠেছেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যকে দীর্ঘকাল সমৃদ্ধ করবে।

এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান, মুক্তচিন্তা বাংলাদেশের আহ্বায়ক আবুল কাসেম হায়দার এবং কবি ও সাংবাদিক শাহীন চৌধুরী।

এছাড়াও ‘সারেঙ’-এর বিশেষ সংখ্যাটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি কামরুজ্জামান, কবি সৈকত হাবিব, কবি আসাদ কাজল এবং এটিএন বাংলার সিইও (বার্তা) ছড়াকার হাসান শরীফ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘সারেঙ’-এর সম্পাদক আবদুর রহমান মল্লিক।

রিপোর্ট : এটিএন নিউজ/সা.সি
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট রাজনীতি সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ