ATN
শিরোনাম
  •  

এনসিটি ইজারা নিয়ে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মতবিনিময় সভা

         
এনসিটি ইজারা নিয়ে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মতবিনিময় সভা

এনসিটি ইজারা নিয়ে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির মতবিনিময় সভা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি। সংগঠনটির দাবি, প্রস্তাবিত ইজারা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ব্যবস্থাপনার তুলনায় বছরে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার কম রাজস্ব পেতে পারে চট্টগ্রাম বন্দর।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া; সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি: জাতীয় স্বার্থে মতবিনিময় সভা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।

সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, গণফোরামের সভাপতি ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কমোডর মুহম্মদ জসিম এনডিসি, পিএসসি, দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক ও পার্বত্য নিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, আমজনতার দলের সদস্য সচিব তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির রিসার্চ উইং। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রয়োজন থাকলেও টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার আগে এর আর্থিক, কৌশলগত ও সার্বভৌমত্ব-সংশ্লিষ্ট প্রভাব বিশদভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা দিলে বছরে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি গুনতে হবে বাংলাদেশকে।

বণিক বার্তা, প্রথম আলো ও যুগান্তরের ৩টি প্রতিবেদনে কিছুটা ব্যতিক্রম রেভিনিউয়ের কথা থাকলেও সার্বিক বিচারে রেভিনিউ ট্রেন্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রতি টিইইউতে এনসিটির গ্রস আয় ছিল ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের দুই ধরণের প্রশাসিনক ব্যয় হয়। ১৩ দশমিক ৬৩ ডলার পরিবর্তনশীল পরিচালন খরচ, এবং ৪১ দশমিক ৩২ ডলার স্থায়ী প্রশাসনিক খরচ। সর্বমোট খরচ ৫৪.৯৫, (প্রায় ৫৫-৫৬ ডলার খরচ)। অতএব, প্রতি টিইইউ কন্টেইনারে এনসিটির নিট আয় হয় ১০৬.৮৭ ডলার।

এনসিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এনসিটি গত বছরে ১৩ লক্ষ ৮৫ হাজার টিইইউ’স কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং করেছে। ফলে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটির নিট আয় হচ্ছে ১৪৮ মিলিয়ন ডলারেও বেশি।

বিপরীতে, দৈনিক যুগান্তরের (২১ জুন ২০২৬) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, “ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব অনুসারে, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতি কনটেইনারে ১৬১.৮২ ডলার রাজস্ব আয়ের বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দরকে সর্বোচ্চ ৯৭.৫০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।” এর থেকে স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল প্রশাসিনক খরচ বাবদ ৫৫ ডলার বাদ দিলে প্রতি টিইইউস কন্টেইনারে নিট রাজস্ব থাকে ৪২.৫ ডলার। আমরা সর্বেশেষ ১৩ লক্ষ ৮৫ হাজার টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং ধরলেও মোট নিট আয় দাঁড়ায় ৫৮.৮৬ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় যেখানে বছরে নিট আয় হয় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দিলে নিট আয় নেমে আসবে মাত্র ৫৮.৮৬ মিলিয়ন ডলারে। আয়ের পার্থক্য দাঁড়ায় ৮৯.১৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি গুনতে হবে বাংলাদেশকে।

বিশ্বের সব দেশের বন্দর পরিচালনার মতো সক্ষমতা ও নলেজ নেই। যেসব দেশের রয়েছে তারমধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। এই শিল্পকে বিশ্বের অনভিজ্ঞ দেশের বন্দরগুলোর পরিচালনার কাজে ব্যবহার করতে পারলে দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় হতো, রিজার্ভ শক্তিশালী হতো। কিন্তু আমরা এর উল্টো চিত্র দেখতে পাচ্ছি। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানব সম্পদ উন্নয়নের নামে বিদেশীদের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ইজারা দেয়ার ফলে মূলত বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি, সার্বভৌমত্ব ঝুঁকি ও পোর্ট অপারেটিং ইন্ডাস্ট্রিকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। অথচ বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান কোনো দেশই তাদের প্রধান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশী শক্তির হাতে ছেড়ে দেয় না।

বাংলাদেশের পোর্ট এন্ড টার্মিনাল অপারেশন্স ইন্ডাস্ট্রি বা বন্দর পরিচালনা শিল্পকে বিদেশীদের না দিয়ে বরং সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করলে দেশের রিজার্ভে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যুক্ত করা সম্ভব হতো।

লিখিত বক্তব্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত বা ভারতীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে সংগঠনটি সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের একই অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রতিযোগিতাগত স্বার্থ রক্ষার জন্য সুস্পষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়।

তবে কোনো কর্মকর্তা জাতীয়তার কারণে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করবেন—এমন দাবির পক্ষে সভায় স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এ ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণে চুক্তির তথ্য, তথ্য-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক ব্যবসা, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।

স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি দাবি করে, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবও বিবেচনা করা উচিত।

তবে কোনো আন্তর্জাতিক জোট বা করিডোরের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার অর্থ বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই জোটের রাজনৈতিক বা কৌশলগত অংশীদার হয়ে যাবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পৃথক চুক্তি ও সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সভায় বক্তারা এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার আর্থিক ও কৌশলগত দিক জনসমক্ষে প্রকাশ, চুক্তির শর্ত নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং জাতীয় স্বার্থে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের দাবি জানান।

রিপোর্ট : এটিএন নিউজ/সা.সি
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ