ATN
শিরোনাম
  •  

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর দাপট, একদিনেই হাসপাতালে ভর্তি ২০ জন

         
পিরোজপুরে ডেঙ্গুর দাপট, একদিনেই হাসপাতালে ভর্তি ২০ জন

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর দাপট, একদিনেই হাসপাতালে ভর্তি ২০ জন

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই কমছে না। গত আট মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ২৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সংখ্যা বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাশের জেলা ঝালকাঠি।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ২১৭ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন।

বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ২৩ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ জন, নেছারাবাদে ১৪ জন, কাউখালীতে ৮ জন, ভান্ডারিয়ায় ১১ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইন্দুরকানি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই।

সদর হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি রোগী

গত আট মাসের হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৫৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এ ছাড়া নাজিরপুরে ৭৮ জন, নেছারাবাদে ২১৬ জন, কাউখালীতে ৯৬ জন, ভান্ডারিয়ায় ২৪২ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কক্ষের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনেরা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর বাবা মো. মারুফ হাওলাদার বলেন, তাঁর মেয়েকে গত রোববার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসাসেবা ভালো পেলেও হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো বলে তিনি জানান।

পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রুমনা বেগম বলেন, ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের একই জায়গায় থাকায় তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক কক্ষ এবং অন্যান্য রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

মশারি ব্যবহারে অনীহা

সরেজমিনে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক রোগী মশারি ব্যবহার করছেন না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নার্সদের নির্দেশনায় কয়েকজন রোগী দ্রুত মশারি টানিয়ে নেন।

হাসপাতালের এক নার্স জানান, ডেঙ্গু রোগীদের নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকেই তা খুলে রাখেন।

রোগীর স্বজন মোহাম্মদ ইয়াসিন অভিযোগ করেন, সাংবাদিকরা আসার পর কয়েকটি মশারি টানানো হয়। ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। একই সময়ে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

‘প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে’

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল কনসালট্যান্ট সুরঞ্জিত সাহা বলেন, এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমছে না। একজন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা শেষ করতে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। এর মধ্যেই নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে।

তিনি বলেন, আগে পাশের জেলা বাগেরহাটের বাদাল এলাকা থেকে ডেঙ্গু রোগী বেশি আসতেন। বর্তমানে পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত খেয়াল রাখতে হবে। জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার পাশাপাশি সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

ড্রেনেজ ও জমে থাকা পানিকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা

সচেতন মহলের মতে, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙা রাস্তার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মানুষের অসচেতনতা ডেঙ্গু বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

পিরোজপুর পৌরসভার বাসিন্দা জালিস মাহমুদ বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো নয়। ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে এবং রাস্তার পাশে পানি জমে থাকে। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ, ফুলের টব ও বিভিন্ন গর্তে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

লার্ভা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম

ডেঙ্গু প্রতিরোধে পিরোজপুর পৌরসভা ও জেলা পরিষদ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বনি আমিন বলেন, মশার লার্ভা নিধনে নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে। বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবন ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও পৌর এলাকার ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর

পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান। তিনি জানান, ডেঙ্গুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আইইডিসিআরের ইনভেস্টিগেশন টিমকে পিরোজপুরে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি দল এসে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

সিভিল সার্জন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে সুপারি ও নারিকেল গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি এবং বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিকে এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।

তদন্ত পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর টিমের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে বলেও জানান সিভিল সার্জন।

রিপোর্ট : এটিএন নিউজ/সা.সি
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ