ATN
শিরোনাম
  •  

এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, তীব্র গ্যাস সংকটে অচলাবস্থা

         
এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, তীব্র গ্যাস সংকটে অচলাবস্থা

তীব্র গ্যাস সংকটে অচলাবস্থা

মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দেশে নতুন করে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা অচল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ সারি ও তীব্র ভোগান্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালটি দ্রুত মেরামত না হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টার্মিনালটি ঠিক কবে সচল হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

গত মঙ্গলবার এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আংশিক আগুন লাগার কারণে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে বলে এক অনুষ্ঠানে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তার ভাষ্য, এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার জানান, সন্ধ্যা পর্যন্ত মেরামতকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আসার পরই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও মেরামতের সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

রাজধানীজুড়ে তীব্র সংকট

গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোতে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকাজুড়ে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারছেন না।

দেশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সংকট চলছে। অনেক এলাকায় সকালে গ্যাস থাকলেও বিকেলে থাকে না, আবার বিকেলে থাকলেও সকালে থাকে না। তবে গত কয়েক দিনে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্পকারখানাও কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস পাচ্ছে না।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইদুল হাসান বলেন, তিতাস এলাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সীমিত গ্যাস দিয়েই গ্রাহকদের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে। পেট্রোবাংলা থেকে সরবরাহ না বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

চাহিদা ৩৮০০, সরবরাহ নেমেছে ২২৬৫ মিলিয়নে

দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এতদিন ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে এফএসআরইউতে যান্ত্রিক ত্রুটির পর সরবরাহ কমে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।

এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন—সব খাতেই। বৃষ্টিপাত ও তুলনামূলক সহনীয় তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট না দেখা দিলেও রাজধানীর অধিকাংশ আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে গ্যাসের অভাবে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।

সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্টেশনেই ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। যেসব স্টেশনে সীমিত গ্যাস সরবরাহ রয়েছে, সেখানেও চাপ কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস মিলছে না।

এবিএন সিএনজির মালিক সৈয়দ সাদাত আহমেদ বলেন, জাতীয় গ্রিডে সংকটের কারণে স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ নেই। ফলে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি কমিশন কাঠামো নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম মৃধা জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কিছুটা গ্যাসের চাপ থাকলেও দিনের বেলায় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। গ্যাসের চাপ ৫ পিএসআইয়ের নিচে নামলে সিএনজি সরবরাহ সম্ভব হয় না। বর্তমানে অনেক সময় চাপ শূন্যের কাছাকাছি থাকছে।

সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারহান নূর বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই স্টেশনগুলো কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস পাচ্ছে না। ফলে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হলেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

ঢাকা জেলা সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের অভাবে দিনের বড় একটি সময় ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে আয় কমে গেছে এবং চালকদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত

পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, ১০-১২ দিন আগেও পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটির কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার কয়েকটি সিএনজি স্টেশনে মাইকিং করে চালকদের জানানো হচ্ছে, স্টেশনে গ্যাস নেই; প্রয়োজনে অন্যত্র যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

সরবরাহ কমেছে বিতরণ কোম্পানিগুলোতেও

পেট্রোবাংলার দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার তিতাসের বিতরণ এলাকায় ১ হাজার ২৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যা আগের দিন ছিল ১ হাজার ৪২২ মিলিয়ন ঘনফুট। একইভাবে বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল, সুন্দরবন ও কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ এলাকাতেও সরবরাহ কমেছে।

দীর্ঘমেয়াদে সংকট বাড়ার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে সীমিত অবকাঠামোর কারণে সরকার চাইলেও বেশি পরিমাণ এলএনজি আমদানি করতে পারছে না।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হয়। এর একটি পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি দেশীয় সামিট গ্রুপ। সামিট গ্রুপকে আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা বাতিল করে। বর্তমানে সরকার নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও সেটি বাস্তবায়নে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।

এ কারণে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প মালিকরা গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ জানিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান মেলেনি।

রিপোর্ট : এটিএন নিউজ/জেড.এস
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট জাতীয় সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ