ATN
শিরোনাম
  •  

ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়ায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড!

         
ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়ায় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড!

ফকল্যান্ড যুদ্ধ

দক্ষিণ আটলান্টিকের বিশাল নীল সমুদ্রের মাঝে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ছোট দ্বীপ। চারদিকে শুধু বরফশীতল বাতাস, উত্তাল ঢেউ আর নিঃসঙ্গ পাহাড়। পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গাটি হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু ১৯৮২ সালে এই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জই হয়ে উঠেছিল দুই দেশের জাতীয় আবেগ, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় এক অগ্নি পরীক্ষার মঞ্চ। এই দ্বীপপুঞ্জই হলো ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। যা আর্জেন্টিনার কাছে পরিচিত মালভিনাস নামে। আর এই দ্বীপের মালিকানা নিয়েই শুরু হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও নাটকীয় যুদ্ধ, ফকল্যান্ড যুদ্ধ।

এই যুদ্ধের পেছনের গল্প শুধু অস্ত্র, সেনা আর গোলাবারুদের গল্প ছিল না। এর পেছনে ছিল বহু বছরের ইতিহাসের গল্প, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং রাজনৈতিক সংকট। আর এই ফকল্যান্ড দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার বিরোধ বহু পুরোনো। ব্রিটেন ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও আর্জেন্টিনা সবসময় দাবি করে এসেছে, এই ভূখণ্ড তাদের ঐতিহাসিক অংশ। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে আর্জেন্টিনার ভেতরে এই দ্বীপকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছিল। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল, অর্থনৈতিক সংকটও তীব্র হচ্ছিল। এমন এক সময়ে তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা জেনারেল লিওপোলদো গালতিয়েরির সরকার জনগণের সমর্থন ফিরে পেতে একটি সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, ফকল্যান্ড দখল।

ছবি
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। আর্জেন্টিনার সেনারা অভিযান শুরু করে ফকল্যান্ড দ্বীপে। কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর তারা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সরিয়ে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেসে তখন হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। জাতীয় পতাকা হাতে তারা উদযাপন করতে থাকে বহুদিনের দাবি পূরণের আনন্দ।

কিন্তু লন্ডনের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ঘোষণা করেন, ফকল্যান্ড পুনরুদ্ধারে ব্রিটেন সামরিক অভিযান চালাবে। হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা একটি ছোট দ্বীপের জন্য ব্রিটিশ নৌবাহিনী বিশাল যুদ্ধজাহাজ নিয়ে দক্ষিণ আটলান্টিকের দিকে যাত্রা শুরু করে। এ যেন আধুনিক যুগের এক অসম লড়াই। একদিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে ব্রিটেন, অন্যদিকে নিজেদের ভূমি রক্ষার বিশ্বাসে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনার সেনারা। দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় এমন এক সংঘাত, যা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়।

যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ১৯৮২ সালের ২ মে। সেদিন ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন এইচএমএস কনকারর আর্জেন্টিনার যুদ্ধজাহাজ এআরএ জেনারেল বেলগ্রানো ডুবিয়ে দেয়। এতে শত শত আর্জেন্টাইন নাবিক প্রাণ হারান। এই ঘটনা যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তোলে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। এরপর শুরু হয় আকাশ ও সমুদ্রপথে ভয়াবহ সংঘর্ষ। আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনী ব্রিটিশ নৌবহরের ওপর একের পর এক হামলা চালায়। কয়েকটি ব্রিটিশ জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনী ধীরে ধীরে ফকল্যান্ডের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে।

ছবি
দ্বীপের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয় স্থলযুদ্ধ। কনকনে ঠান্ডা, কাদা, প্রতিকূল আবহাওয়া-সবকিছু উপেক্ষা করে দুই দেশের তরুণ সৈন্যরা লড়াই চালিয়ে যায়। অনেক সেনা তখনো জীবনের শুরুতেই ছিল, কিন্তু যুদ্ধ তাদের ঠেলে দেয় ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি।

অবশেষে ১৯৮২ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৭৪ দিনের এই যুদ্ধে ব্রিটেন বিজয়ী হয় এবং ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে নেয়। তবে এই বিজয়ের পেছনে ছিল অসংখ্য প্রাণহানি ও অগণিত পরিবারের শোক। যুদ্ধে ব্রিটেনের প্রায় ২৫০ জন এবং আর্জেন্টিনার প্রায় ৬৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

ফকল্যান্ড যুদ্ধকে কেবল একটি দ্বীপ দখলের লড়াই বললে ভুল হবে। কেননা এটি ছিল জাতীয় সম্মান, রাজনৈতিক টিকে থাকা এবং সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শনের এক নির্মম অধ্যায়। সম্প্রতি ফিফা ২০২৬ এর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডে সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর আবারও আলোচনায় আসে এই ফকল্যান্ড যুদ্ধ। আর এই ফকল্যান্ড দ্বীপ আজও নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।

রিপোর্ট : সা.সি/জেড.এস
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট খেলা সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ