ATN
শিরোনাম
  •  

কুপি বাতি: শৈশব, সংগ্রাম আর স্মৃতির সোনালি অধ্যায়

         
কুপি বাতি: শৈশব, সংগ্রাম আর স্মৃতির সোনালি অধ্যায়

কুপি বাতি: শৈশব, সংগ্রাম আর স্মৃতির সোনালি অধ্যায়

শিকড়ের আলো: হারানো দিনের এক সোনালি মহাকাব্য

চারদিকে এখন আলোর রোশনাই। একটা বোতাম টিপলেই নিমিষে কর্পূরের মতো উড়ে যায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। আধুনিকতার এই চোখধাঁধানো আলোয় আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, পেছনের অন্ধকার তাড়ানোর আদিম লড়াইটাকে আজ বড্ড সহজ মনে হয়। কিন্তু কৃত্রিমতার চাদর সরিয়ে একটু থমকে দাঁড়িয়ে যদি স্মৃতির ধূসর পাতা উল্টানো যায়, তবে মনে পড়বে—আজকের এই ঝলমলে আলো কিন্তু একদিনে আসেনি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের শৈশব-কিশোরবেলার এক নীরব, নিঃসঙ্গ সাক্ষী, যাকে গ্রামবাংলায় কেউ ডাকত ‘কপি’, কেউ বা ‘কুপি বাতি’। না, এটি আধুনিক কোনো ক্যাফের সুগন্ধি পানীয় নয়; এটি ছিল তামা বা পিতলের তৈরি এক টুকরো ইতিহাস, যার বুকে লুকিয়ে থাকত অন্ধকার জয়ের গল্প।

দিন কয়েক আগে এক ভীষণ দরকারি কাজে ব্যস্ত শহরের চেনা কোলাহলের মাঝে হাঁটছিলাম। হুট করেই একটা পুরোনো ভাঙাচোরা দোকানের কোণে ধুলোবালি আর অবহেলার মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম এই জিনিসটি। অবিকল আমাদের সেই ছোটবেলার চেনা ‘কুপি বাতিটি’। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহল ম্লান হয়ে চোখের সামনে বায়োস্কোপের মতো ভেসে উঠল চেনা গ্রাম, মাটির ঘর আর উঠোন। শখের বসে, নাকি হারানো অতীতকে ছুঁয়ে দেখার এক তীব্র, অবোধ্য আকুলতায়, মুঠোফোনের ফ্রেমে বন্দী করে নিলাম পিতলের সেই সোনালি স্মৃতিকে।

নব্বইয়ের দশকের সেই মায়াবী সন্ধ্যা ও স্মৃতির গন্ধ

মনে পড়ে, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে গ্রামে এক অদ্ভুত মায়াবী নীরবতা নেমে আসত। আজকের মতো ঘরে ঘরে বিদ্যুতের ঝলকানি বা লোডশেডিংয়ের হাহাকার ছিল না, কারণ অন্ধকারটাই ছিল তখন স্বাভাবিক। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ঘরের মা-বোনদের একটা অলিখিত, পবিত্র দায়িত্ব ছিল। আলমারি বা কাঠের তাকের ওপর থেকে কুপি বাতিগুলো পেড়ে এনে কাপড়ের টুকরা দিয়ে পরম মমতায় মুছে সাফ করা হতো। তারপর খুব সাবধানে, যেন এক ফোঁটাও অপচয় না হয়, সেভাবে ঢালা হতো কেরোসিন তেল। বাতির সরু মুখটা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো পুরোনো শাড়ির কাপড় বা পাটের সুতলি দিয়ে পরম যত্নে তৈরি করা সলতে। তেলভেজা সলতেটা যখন ভারী হয়ে উঠত, তখন দেশলাইয়ের একটা কাঠির ছোঁয়ায় এক মৃদু শব্দে জ্বলে উঠত এক চিলতে লালচে-হলুদ আগুন।

সেই আলোর জোর হয়তো আজকের নিয়ন বা এলইডি বাতির মতো তীব্র ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে একটা স্বর্গীয় মায়া ছিল। দেয়ালের গায়ে সেই আলোর মৃদু কাঁপন আর মানুষের বিশাল আকৃতির ছায়া মিলেমিশে ঘরের ভেতর তৈরি হতো এক রূপকথার জগৎ। বিশেষ করে বর্ষার রাতে, যখন বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি ঝরত, তখন এই কুপির টিমটিমে আলোয় দাদী-নানীদের কোল ঘেঁষে ভূতের গল্প শোনার যে রোমাঞ্চ, তা আজ কোটি টাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দামি গ্যাজেট স্ক্রল করেও পাওয়া অসম্ভব।

কুপির আলোয় পুড়ত চোখ, গড়ত ভবিষ্যৎ

আমাদের পড়াশোনা, বড় হওয়া—সবই ছিল ওই কুপি বাতির আলোয়। সন্ধ্যার পর ঘরের কাঠের বা বাঁশের টেবিলে যখন কুপির আলো জ্বলত, আমরা দলবেঁধে বই নিয়ে বসতাম। পড়তে পড়তে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসত। কখনো সলতে বেশি উসকে দিলে ঘর ভরে যেত ঝাঁঝালো কালো ধোঁয়ায়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আয়নায় মুখ দেখলে দেখা যেত, নাকের নিচে, কপালে জমে আছে হালকা কালির আস্তরণ। সেই কালি-মাখা মুখগুলোই ছিল তখনকার একেকটা নিষ্পাপ স্বপ্ন। রাতে ঘুমানোর আগে যখন ফুঁ দিয়ে বাতিটা নেভানো হতো, তখন ঘরের কোণে ভেসে বেড়ানো তেলের পোড়া গন্ধ আর ধোঁয়ার মাঝে মিশে থাকত এক পরম তৃপ্তির, নিস্তরঙ্গ ঘুম।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই কুপি বাতিকে হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে বড্ড ‘সেকেলে’, ‘অকেজো’ বা ‘ব্যবহার-অনুপযোগী’ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু বুক ছুঁয়ে ভাবলে অনুভব করা যায়—আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থা, ঝলমলে বহুতল ভবন আর ডিজিটাল বাংলাদেশের যে রূপ আমরা দেখছি, তার মূল ভিত্তিস্তম্ভ কিন্তু স্থাপন করেছিলেন সেই ছোট, অবহেলিত বাতিটিই। ওই টিমটিমে আলোর নিচে বসেই কত রাত জেগে মানুষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক বা দেশের মহান নেতা হয়েছেন। ওই সামান্য আলোটাই ছিল তৎকালীন অন্ধকার সমাজকে আলো দেখানোর একমাত্র বাতিওয়ালা।

বর্তমানের কৃত্রিম আলো আর শিকড়ের ঋণ

আমরা এখন আধুনিক সমাজে বাস করি, নিজেদের খুব আধুনিক ভাবি। আধুনিকতা আমাদের যান্ত্রিক সুখ দিয়েছে প্রচুর, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের ভেতরের সেই স্নিগ্ধ আত্মিক শান্তি। বর্তমানের এই ঝলমলে উৎসব আর কৃত্রিম আলোকসজ্জা দেখে আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছি যে, প্রায়শই আমাদের অতীতকে ভুলে যাই, ভুলে যাই আমাদের ফেলে আসা কষ্টের দিনগুলোকে।

কিন্তু সত্য তো এটাই—যে বাতিটির হাত ধরে আমরা অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে আলোর এই মহাসমুদ্রে এসে দাঁড়িয়েছি, তাকে ভুলে যাওয়া মানে নিজের অস্তিত্বকে, নিজের মাটিকে অস্বীকার করা। শহরের এক ধুলোবালি-মাখা কোণে খুঁজে পাওয়া এই পিতলের কপি বাতিটি কেবল একটা জড় বস্তু নয়; এটি আমাদের শৈশবের নস্টালজিয়া, আমাদের আবেগ আর আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। এরা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে চরম শূন্যতা থেকেও আলো ছড়াতে হয়। বর্তমানের শত আলোর রোশনাইয়ের মাঝেও তাই আমাদের এই পুরোনো দিনগুলোকে, এই অবহেলিত রূপকথাগুলোকে মনে রাখা এবং মনে-প্রাণে মূল্যায়ন করা ভীষণ জরুরি। কারণ, যে জাতি তার পেছনের অন্ধকার পথটা আর সেই পথের বাতিটাকে সম্মান দিতে জানে না, সে কখনোই সামনের আলোর প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে না।

লেখক: সাব্বির হোসেন
স্টুডেন্ট কাউন্সিলর, এডমিশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

রিপোর্ট: এটিএন নিউজ / মা.ই.স
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট শিল্প-সাহিত্য সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ