ATN
শিরোনাম
  •  

‘বনলতা সেন’-এ আবারও জীবন্ত জীবনানন্দ

         
‘বনলতা সেন’-এ আবারও জীবন্ত জীবনানন্দ

‘বনলতা সেন’-এ আবারও জীবন্ত জীবনানন্দ

‘আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন...’— না, আপনি ভুল। অনেক খুঁজেছি আপনাকে পৃথিবীর পথে পথে, মিলু দা! পৃথিবীর সব প্রেম নিয়ে, এইসব দিনরাত্রির মায়াজালে, ধূসর পথে, কার্তিক কি অঘ্রাণের রাত্রি শেষে— খুঁজেছি তো আপনাকে। যাকে আমি চিরদিন ভালোবাসি... অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি। আপনি তো সেই প্রাণসখা। তারপরও কি বলবেন যে খুঁজিনি?

বরিশালের বগুড়া রোডের (বর্তমান মুন্সিগ্যারেজ) আপনার কবেকার ধূসর বাড়িতে গিয়ে, বিএম কলেজের ঘন সবুজ মাঠের পাশে বা টেরাকোটা আঁকা লাল দালানের বারান্দায় চোখ তুলে চেয়ে। খুঁজেছি আপনার মমতাময়ী মা কুসুমকুমারীর সুতির আঁচল ছুঁয়ে।

ভিজে মেঘের দুপুরে গাবখান থেকে রাজাপুরের দিকে বয়ে যাওয়া ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে। ঢাকার আজিমপুরে, আপনার স্ত্রী লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে প্রথম পরিচয় যেখানে।

আপনাকে খুঁজতে কোথায় যাইনি বলুন? আপনার যেখানে সাধ চলে গেছে, আর আমি বাংলার পাড়ে আপনাকে খুঁজেছি পথে পথে, মেঠো চাঁদ ও মেঠো তারাদের সঙ্গে। ধবলাটের সমুদ্রের দিকে যেতে যেতে— খুঁজেছি ডিব্রুগড়ে, বেলগাছিয়া, শ্যামবাজার, ধর্মতলা ও কালীঘাটের হিম হয়ে-আসা শীতের রাতে (আসলে দূর অন্ধকারে)। কয়েকবার কলেজ স্ট্রিটে চুপচাপ নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে। দিল্লির রামজাস কলেজের ক্লাসরুমেও নেই আপনি। কোথায় যে হারালেন?

দাঁড়িয়ে দেখেছি ট্রামলাইনে মাথা নিচু করে চুপচাপ আপনি যাচ্ছেন কিনা হেঁটে। অথচ যে জীবন ফড়িঙের— দোয়েলের, সে জীবনই বেছে নিলেন আপনি। সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো— তবুও কেউ সময়স্রোতের পরে সাঁকো বেঁধে দিতে চায়। সেখানেও আপনাকে পাইনি।

বুদ্ধদেবের কলমে, সঞ্জয়, ভূমেন্দ্র গুহ, আব্দুল মান্নান সৈয়দের কাছে— কার কাছে যাইনি বলুন? হাওয়ার রাতে কখনো বিছানা ছেড়ে নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে যেতে খুঁজেছি ক্লিনটন বি. সিলি, হরিশংকর জলদাস, আকবর আলি খান, শাহাদুজ্জামান, গৌতম মিত্রের কাছে। সত্যিই আপনি এক দূরতম দ্বীপ, বিকেলের নক্ষত্রের কাছে—খুঁজে খুঁজে আমি ক্লান্ত প্রাণ এক।

যত স্রোতে বয়ে যায় সময়ের,
সময়ের মতন নদীর
জলসিঁড়ি, নীপার, ওডার; রাইন, রেবা, কাবেরীর—
আপনি তত বয়ে যান,
আমিও তত বয়ে চলি,
তবুও কেহই কারু নয়।


তখন হঠাৎ— আমাকে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলেন কে জানেন? মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ভাই। কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয় আপনার খোঁজ মিলিয়ে দিলেন তিনি। হঠাৎ মেঠোপথে পেয়েছি আপনাকে— ‘বনলতা সেন’-এর ঠিকানায়। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সেলুলয়েডের দৃশ্যপটের পরতে পরতে আপনার অনন্ত ঘুম ভেঙে আবার জাগিয়ে দিলেন বাংলার এই সবুজ করুণ ডাঙায়।

২০২৩/২৪-এ পারস্য গালিচা, কাশ্মীরি শাল, বেরিন তরঙ্গে নিটোল মুক্তা-প্রবাল দিয়ে সাজানো তাঁর বারিধারার লেকপাড়ের আলো-আঁধারি ঘরে ছায়ার মতো আপনাকে দেখলাম আবার যেন। সেখানে কত সন্ধ্যার আঁধার পেরিয়ে মুখোমুখি বসে দারুণ মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ভাইয়ের সঙ্গে আলাপে পেতাম আপনাকে। জেনেছিলাম, কান্তারের পথ বেয়ে বেয়ে দারুচিনি দ্বীপের ভেতর তিনি একা এঁকে চলেছেন সেলুলয়েডে নীরবে-নিভৃতে আপনার আগমনী।

পৃথিবীর সব রূপ নিয়ে, পৃথিবীর সব প্রেম দিয়ে আপনার বিলুপ্ত হৃদয়, আপনার বিলীন স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছোটভাই খায়রুল বাসার ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায় ভেসে উঠেছে। এখন তোমার পাখনায় আমাদের পালক, আমাদের পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন।

পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতন রূপ নিয়ে দূর থেকে ‘বনলতা সেন’ আবার ফিরে এসেছে আপনার নিভৃত জীবনজুড়ে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ভাইয়ের অনবদ্য সিনেমায়। আসছে ঈদে।

সব পাখি ঘরে ফেরে— সব নদী— ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার
নাটোরের বনলতা সেন।


লেখক: খন্দকার লেলিন
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ
(ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া)


রিপোর্ট: এটিএন নিউজ / মা.ই.স
পাঠকের মন্তব্য

সংশ্লিষ্ট মতামত সংবাদ


অন্যান্য সংবাদ